নানিয়ারচরে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

3

নানিয়ারচরে চলমান করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে জরুরী এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক করোনা ভাইরাস জনিত সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধকল্পে শর্তসাপেক্ষে সার্বিক কার্যাবলী/চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বর্ধিত করণ প্রসঙ্গে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

techchtbd

শুক্রবার সকাল ১১ টায় নিজ কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত সমূহ আলোচনা করেন নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি রহমান তিন্নি।

এসময় নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান হাওলাদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, নানিয়ারচর জোন প্রতিনিধি সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মোঃ সাদেকুল ইসলাম, নানিয়ারচর থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মোঃ সাব্বির রহমান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার নুয়েল খীসা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল হক, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জতিন কান্তি চাকমা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং মটর ও সিএনজি চালক সমিতির সভাপতিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

নানিয়ারচরে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

সভায় নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি রহমান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব তৌহিদ এলাহী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের  সিদ্ধান্ত সমুহ আলোচনা করেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনা ভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধকল্পে এবং পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার আগামী ৩০ মে’র পর শর্তসাপেক্ষে দেশের সার্বিক কার্যাবলী এবং জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ/সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সম্পূর্ণ প্রজ্ঞাপনটি পাঠকের সুবিধার্থে নিচে উল্লেখ করা হলোঃ

১. আগামী ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ৫, ৬, ১২ ও ১৩ জুন সাপ্তাহিক ছুটি এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

২. নিষেধাজ্ঞাকালে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় জনসাধারণের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। প্রতিটি জেলার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে চেকপোস্টের ব্যবস্থা থাকবে। জেলাপ্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এ নিয়ন্ত্রণ সতর্কভাবে বাস্তবায়ন করবে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে চলাচলে নিষেধাজ্ঞাকালে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অতীব জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (প্রয়োজনীয় কেনা-বেচা, কর্মস্থলে যাতায়াত, ওষুধ কেনা, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে আসা যাবে না। তবে সর্বাবস্থায়ই বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক পরিধানসহ অন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. নিষেধাজ্ঞাকালীন জনসাধারণ ও সব কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জারি করা নির্দেশমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

৪. হাটবাজার, দোকান-পাটে ক্রয়-বিক্রয়কালে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্য স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন করতে হবে। শপিং মলের প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শপিংমলে আগত যানবাহনকে অবশ্যই জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাটবাজার, দোকানপাট ও শপিংমল আবশ্যিকভাবে বিকেল ৪টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।

৫. আইন-শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত সংস্থা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন- ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্য জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের (স্থলবন্দর, নদীবন্দর এবং সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবাসহ অন্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবে।

৬. সড়ক ও নৌপথে সব ধরনের পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত যানবাহন (ট্রাক, লরি, কার্গো ভেসেল প্রভৃতি) চলাচল অব্যাহত থাকবে।

৭. কৃষিপণ্য, সার, বীজ, কীটনাশক, খাদ্য, শিল্প পণ্য, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের মালামাল, কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা এবং এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।

৮. চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী এবং ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বহনকারী যানবাহন ও কর্মী, গণমাধ্যম (ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া) এবং ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কে নিয়োজিত কর্মীরাএ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবেন।

৯. ওষুধশিল্প, কৃষি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো, উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পসহ সকল কলকারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে চালু রাখতে পারবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রণীত বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণে নির্দেশনা প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

১০. নিষেধাজ্ঞাকালীন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে না। তবে, অনলাইন কোর্স/ডিসট্যান্স লার্নিং অব্যাহত থাকবে।

১১. ব্যাংকিং ব্যবস্থা পূর্ণভাবে চালু করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।

১২. সব সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিস নিজ ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, অসুস্থ কর্মচারী এবং সন্তান সম্ভবা নারীরা কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকবেন। এক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জারি করা ১৩ দফা নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্র ব্যতীত সব সভা ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে আয়োজন করতে হবে।

১৩. উক্ত নিযেধাজ্ঞাকালে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবে না। উক্ত সময়ে শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি নিশ্চিত করে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল করতে পারবে। তবে সর্বাবস্থায় মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জারি করা নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনেচলা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।

১৪. উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষ নিজ ব্যবস্থাপনায় প্লেন চলাচলের বিষয় বিবেচনা করবে।

১৫. উক্ত নিষেধাজ্ঞাকালে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত ও অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক মসজিদে সর্বসাধারণের জামাতে নামাজ আদায় এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা অনুষ্ঠান অব্যাহত থাকবে।নানিয়ারচরে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিতএছাড়াও শিউলি রহমান উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সাথে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে মতামত গ্রহণ করেন এবং নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমুহ গ্রহন করেন।

১. দীর্ঘদিন সাধারণ ছুটিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ নিজ কর্মস্থলে আসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে উপজেলায় প্রবেশ করেই হোম/প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেইন্টান নিশ্চিত করবেন।
তবে বহিরাগত সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে জরুরী প্রয়োজন অথবা বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া উপজেলায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

২. কৃষিজাত পণ্য ও মৌসুমী ফল আনারস কাঁঠাল পরিবহনের ক্ষেত্রে যানবাহনসমূহ কে কোয়ারেইন্টান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনী পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের কে বিশেষভাবে নজরদারির আহবান করা হয়।

৩. উপস্থিত সকলের মতামতের ভিত্তিতে ভাড়ায় চালিত ১৫টি মোটর সাইকেল ও ১০টি সিএনজি জরুরী প্রয়োজনে বা বিশেষ প্রয়োজনে যাত্রী পরিবহণ করার অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন নির্বাহী কর্মকর্তা। সেক্ষেত্রে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলে সর্বোচ্চ একজন ও প্রতি সিএনজি ২ জন করে যাত্রী পরিবহণ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে একজন চালক সপ্তাহ শেষে কোয়ারেইন্টানে গেলে পরবর্তি চালক যাত্রী পরিবহণ করবেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে সকল কর্মহীন চালকরা যাত্রী পরিবহণ করবেন।

৪. জনসমাগম রোধে প্রতিটি হাট-বাজারে ছোট-বড় তিনটি থেকে পাঁচটি মুদি দোকান, কাঁচামালের দোকান ও সকল ঔষধের দোকান খোলার অনুমতি দেয়া হয়।

৫. স্থানীয় সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিউলি রহমান বলেন, “আমি নানিয়ারচরের সেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলোকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আমরা নানিয়ারচর কে এতদিন করোনা আক্রান্ত উপজেলা হিসেবে বিবেচিত হয়েছি। যেহেতু এখন আমাদের এলাকায় এযাবৎ একজন করোনা পজেটিভ রোগী পাওয়া গিয়েছে, সুতারং স্বাস্থ্য বিভাগ, সেনাবাহিনী ও পুলিশকে আরও এগিয়ে আসতে হবে।” তিনি আরও জানান, সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এখন মাঠ পর্যায়ে নিদর্শন পাওয়া গেলে তাঁদের কে নমুনা সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে সাহায্য করবে এবং বহিরাগত যানবাহণ গুলোকে জীবাণুনাশক স্প্রে কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।

এসময় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ নুরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, দীর্ঘদিন ঘরে লকডাউনে থেকে গ্রামের কৃষকরা বিভিন্নভাবে ত্রাণ সামগ্রী পেয়েছেন। এবং এসব কৃষকরা নিজ এলাকায় হলেও কৃষিজাত পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন লকডাউনে থেকে অসহায় জীবন যাপন করছেন মধ্যবিত্ত, কর্মহীন ব্যবসায়ী ও চালকরা। এখনও যারা ত্রাণ পাইনি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চালক ও কর্মহীনদের ত্রাণের আওতায় আনতে দ্বাবী জানান ভাইস চেয়ারম্যান।

উল্লেখ্য গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হবার পর ২৭ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বর্তমানে দেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮২ জনে। অন্যদিকে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৮৪৪ জনে।

 

আরো পড়ুন-

Share.

3 Comments

Leave A Reply